ঝর্নার রানী-খৈয়াছড়াঃ ০২



আমাদের ট্র্যাকিংঃ আমরা যখন বাস থেকে নামি তখন ভোরের আলো ফোটেনি এবং অনেক বৃষ্টি হচ্ছিলো, আমি ফজর এর নামায আদায় করার পরেই আমরা হেটে রওনা দিলাম ঝর্নার রানী কে দেখার জন্য। যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছিলো ছাতাও নেয়া হয়নি তাই পলিথিন মাথায় দিয়েই সামনের দিকে আগাতে শুরু করলাম। সবাই ট্র্যাকিং উপযোগী জুতা পরে নিয়েছিলাম, তার পরেও কেনো জানি হঠাত করেই পিচ্চিল খেলাম, জা দেখে সবাই মজা পেলো। আকা বাকা পাহাড়ি ঝিরি পথ ধরে আগাতে থাকলাম পথেই দেখা পেলাম পাহাড়ি আদিবাসিদের দেখা, তারা খুব পরিশ্রমী এবং খুব ভোরে উঠে, যাতে করে তারা সারাদিন অনেক কাজ করতে পারেন। অনেক ছোট ছোট বাচ্চারাও আমাদের আগে চলে জাচ্ছে পাহাড়ের গা বেঁয়ে। কারন তাদের প্রতিদিনের কাজ হচ্ছে মাইলের পর মাইল পাহাড় বেঁয়ে দূর থেকে কাঠ, গাছের গুঁড়ি, পানি, ফলমূল বা মাছ সংগ্রহ করে নিজেদের জন্য এবং কিছু বিক্রি করে  জীবিকা নির্বাহ করা। বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার করে গুড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে এর মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলেছি আমরা, এখনো ঝর্নার সামনেই যেতে পারি নাই, শুধু ঝর্না থেকে বয়ে আসা প্রথম ফ্লো টা পেলাম, আমাদের শাকিল ভাই তার ব্যাগ রেখেই পা ভিজাতে নেমে গেলেন, আহ কি প্রশান্তি, আমিও তখন মোবাইল দিয়ে চটজলদি তুলে ফেললাম কতগুলো ছবি। ঝিরি পথের শুরুতেই বাশ বিক্রি করতে দেখা যায়।কারন পাহাড়ি আকাবাকা পিচ্ছিল পথ যদি পরে যায়! আর আমরা কোন বাশ নেই নাই কারন, আমরা ভোর বেলা গিয়েছি তখন কেউ যায় নাই, আর আস্তে আস্তে লোক সমাগম হলে ঝর্নার পানিতে গোসল করে ফিরে আসতে গেলে পাহাড়ি ঢালু পথ ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যায়, এর জন্য সাপোর্ট এর জন্য বাশ লাগে! দাম মাত্র ২০ টাকা, আর ঝর্নার থেকে ফেরত এসে যদি বাশ টা ফেরত দেয়া হয় অক্ষত অবস্থায় তাহলে ১০ বা ০৫ টাকা ফেরত দিয়ে থাকে বাশ দোকানের মালিক ওয়াও!!! জাই হোক সকল ঝিরিপথ উঁচুনিচু পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে যখন আমরা ঝর্নার একেবারেই কাছাকাছি,ঠিক তখনি সেই রকমের গর্জন শোনা জাচ্ছে।দূর থেকেই গর্জন শুনে বোঝা যাচ্ছিলো যে মানুষ কেন আসে এই অপুর্ব ঝর্নাটা দেখার জন্য। তা ৫ মিনিটের মত লাগলো সেই মূল ঝর্নার ১ম ধাপ এর কাছে যেতে। যাওয়ার পরেই আমরা চার জন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষন এর সৌন্দর্য দেখছিলাম, প্রায় ৬০ ফুট উচু খাঁড়া পাহাড়ি ঢল আছড়ে পরছে সমতল এলাকায় আর সাথে অনেক গর্জন। এর জন্যই একে ঝর্নার রানী বলা হয়, নামটা সার্থক। দেখেই সবাই নামার ঝর্নায় প্রস্তুতি গ্রহন করলো আমি তাদের এখন ঝর্নায় নামতে না করলাম কারন ঝর্নার মূল লেভেল ৯ টা এই ১ম লেভেলে ভিজে গেলেই বাকি পথ ভেজা কাপড় নিয়ে উঠা আর ট্র্যাকিং করা খুব কষ্ট সাধ্য হয়ে পরবে। তাই ঐ ১ম লেভেল থেকে শুধু ছবি তুলেই ২য় লেভেলের উদ্যেশ্যে রওনা দিলাম।

বাম পাশে দিয়ে খাঁড়া প্রায় ৮০ ডিগ্রি এঙ্গেল প্রতিটা গাছের সাথে দড়ি বাঁধা আর গিঁট দেয়া কারন ভেজা হাত দিয়ে ধরে উঠলেও জাতে কেউ পিছলে পরে না যায়। আমি সবার আগে উঠে ভিডিও করতে লাগলাম, শাকিল ভাই, আশরাফুল ও শামিম খুব আনন্দ ও সাহসিকতার মধ্যে দিয়ে রোপ ট্র্যাকিং করে উপরে উঠে আসছিলো। তার পরে ২য় লেভেলের ট্র্যাকিং শুরু সেইটা আরো এডভেঞ্চার উচু পাহাড় বেঁয়ে যেতে হয় আর কোন দড়ি নেই সেইখানে খুবই রিস্কি জায়গা গাছের গুঁড়ি, পাহাড়ি গাছের লতা ধরে বেঁয়ে বেঁয়ে ঊঠতে হয়।
আমি ভয় পাচ্ছিলাম ছোট ভাই শামিম কে নিয়ে,এই ভয়ানক পথ পাড়ি দিতে আমাদেরই ভয় হচ্ছিলো আর সে ত ছোট। তার পরেও কিছুটা ভয় কম কাজ করেছিলো কারন, শাকিল ভাই হচ্ছে খেলোয়ার একজন মানুষ তিনি তো পারবেন আর স্ট্যামিনাও আছে, আর আমি, আশরাফুল ও শামিম স্কাউটিং করেছি রোপ ট্র্যাকিং, হাইকিং করেছি অনেক তাই ঐ সব দিক থেকে ভয় নাই। ২য় স্টেপ দেখেই চোখ কপালে কারন, ২য়, ৩য় আর ৪র্থ স্টেপ এর পানি এক সাথে সমান তালে আছর পরছে স্টেপ বাই স্টেপ ২য় স্টেপ দেখার পরে ৩য় লেভেলের সামনে যখন আগাচ্ছিলাম সেই পথ ছিল খুবই ভয়ঙ্কর কারন নিচে পড়লেই সোজা ৫০ ফুট নিচে পাথরের গায়ে আছরে পরতে হবে!!! তাই খুব সাবধানতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছি, সবাইকে আমি সাবধান করছি যে আস্তে আস্তে পা ফেলে এগিয়ে আসুন কোন ভয় নেই, সেই আমি হঠাত করেই শুকনা জায়গায় মানে যেখানে কোন পিচ্ছিল নয় সেই লেভেলের ধপাশ কর আবারো আছাড় খেলাম। আবারো সবাই হেসে উঠল। এই ভাবে যখন আমরা ৮ নং স্টেপ এ আসলাম,আমি বললাম আরো যাবেন কি? শাকিল ভাই বললও যে এসেছি যেহেতু শেষটা দেখেই যাই তার সাথে আশরাফুল ও শামিম বলে রাজি, তাই একেবারে শেষ চূড়ায় ঊঠলাম যেখান থেকে শুধু আকাশ,পাহাড় আর পাহাড় দেখা যায় মানে কোন ঝর্না নেই আর! এইবার নামার সময় বাধলো বিপদ কারন, ঝিরিপথ ট্র্যাকিং করতে করতে পুরো শরির ভিজে গিয়েছে তাই নামার সময় পা পিছলে জাচ্ছে বার বার, খুব সাবধানতার সাথে আমরা নামছি, প্রতিটা স্টেপ থেকে যখন নামছি অন্য ভ্রমনকারীরা তখন দেখে অবাক এতো তারাতারি এতো উপরে গেলাম আবার এসেও পরলাম আর শুধু জিজ্ঞাস করে-ভাই আর কতো দূর বা ভাই আরো ঝর্না কি আছে উপরে?
সর্বশেষে ১ম লেভেলের সেই মনোমুগ্ধকর ঝর্নার কাছে এসেই আমরা আমাদের শরির কে মেলে দিলাম ঝর্নার রানীর কোলে শীতল পানিতে



Comments